প্রযুক্তির ক্যান্সার ডিপফেক টেকনোলজি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা এই ডিপফেক ভিডিওগুলোতে নানা ধরনের রূপান্তর ঘটে অনেক কম সময়ে। আর তাই খালি চোখে এইসব ভিডিওর আসল-নকলের যাচাই করা যায় না
Please wait 0 seconds...
Scroll Down and click on Go to Link for destination
Congrats! Link is Generated

আপনি যদি গেম অফ থ্রোনস ফ্যান হন আর আপনি যদি গেম অফ থ্রোনসের হতাশাজনক সমাপ্তির জন্য জন স্নোর 'ক্ষমা চাওয়ার' ভিডিও দেখে থাকেন কিংবা বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হন এবং বারাক ওবামাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্টুপিড ও অযোগ্য বলার ভিডিও কিংবা মার্ক জাকারবার্গকে ডাটা চুরি নিয়ে গর্ব করার ভিডিও দেখে থাকেন তাহলে আপনি নিঃসন্দেহে ডিপফেক টেকনলোজির ব্যবহার দেখে ফেলেছেন।

প্রযুক্তির ক্যান্সার ডিপফেক টেকনোলজি

ফটোশপে চেহার অদল বদল, বিকৃতি করে তা খারাপ কাজে ব্যবহারের নজির কম নেই। অনেককেই প্রযুক্তির উন্নতির এই নেতিবাচক দিকে ভুগতে হয়েছে। ডায়নামাইট যেমন পাহাড় ভাঙ্গতে আবিষ্কৃত হলেও পরবর্তীতে তা বোমা হিসেবে মানুষ মারার জন্য ব্যবহার শুরু হয়, ঠিক তেমনি প্রযুক্তির ক্রমশ উন্নতির ধারাবাহিকতায় এক ক্যান্সার হলো ডিপফেক টেকনোলজি। 

প্রযুক্তির ক্যান্সার ডিপফেক টেকনোলজি

ধরুন হঠাৎ করেই আপনার কাছের কোন মানুষ আপনাকে একটি ভিডিও দিল, ভিডিও চালু করে আপনি অবাক, অশ্লীল এক ভিডিওতে আপনাকে দেখা যাচ্ছে; চেহারা, ভয়েস, এক্সপ্রেশন অবিকল আপনার।  আপনি জানেন ভিডিওর ব্যক্তি আপনি নন। কিন্তু ভিডিওটি এতটাই বাস্তব যে আপনার নিজের ও অবিশ্বাস করতে হচ্ছে ভিডিওর ব্যক্তি আপনি নন। কিন্তু কি করে এটা সম্ভব? এটা সম্ভব ডিপফেক টেকনলোজি দিয়ে। 

ডিপফেক টেকনোলজি কি?

২০১৭ সালে সর্বপ্রথম ডিপফেক টেকনোলজি প্রচারণা পায়। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে অত্যন্ত বাস্তব; কিন্তু আদতে ভুয়া ভিডিও এবং অন্য ধরনের মিথ্যা দিয়ে। 

মার্ক জাকারবার্গ এর ডিপফেক ভিডিও

সাধারণভাবে ডিপফেক বলতে আমরা নকল ভিডিও বা অডিওকে বুঝি। ডিপফেক নামটির মধ্যেই এর সংজ্ঞা রয়েছে। ইংরেজি শব্দ ডিপ মানে গভীর এবং ফেক মানে নকল। অর্থাৎ, ডিপফেক বলতে গভীরভাবে নকল করা হয়েছে এমন কিছুকে বোঝায়। আপাত দৃষ্টিতে ভিডিওটি আসল বলে মনে হলেও তা প্রকৃতপক্ষে নকল। ছবিতে এই চেহারা অদলবদল এর কাজটি অনেক সহজ হলেও ভিডিও তে করা দুঃসাধ্য। কিন্তু ডিপফেক টেকনোলজি এর মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে চেহারা প্রতিস্থাপন করা যায় নিখুঁতভাবে। কম্পিউটাতের নিউরাল নেটওয়ার্ক বা ডিপ লার্নিং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এটি করা হয় বলে এটিকে বলা হয় ডিপফেক।

ডিপফেক টেকনোলজি কিভাবে কাজ করে?

ডিপফেক ভিডিও বানানোর প্রধান অস্ত্র হলো মেশিন লার্নিং। মেশিন লার্নিংয়ের একটি প্রযুক্তি যা “জেনারেল অ্যাডভারসেরিয়াল নেটওয়ার্ক” (GAN) যার মাধ্যমে প্রথমে টার্গেটেড ব্যক্তির চেহারা বিভিন্ন এংগেল থেকে এবং বিভিন্ন অভিব্যক্তির হাজারখানেক ছবি সংগ্রহ করে এবং সেই ছবিগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরন করে তার মুখের সব ধরনের অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তির একটি সিমুলেশন তৈরি করা হয়। শুধু চেহারা ও অভিব্যক্তিই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তরোত্তর উন্নতির ফলে ঐ টার্গেটেড ব্যক্তির গলার স্বরও হুবুহু নকল করা হয়। তারপর যে ভিডিওটি নকল করা হবে তা কাউকে দিয়ে করানো হত অথবা যে ভিডিওটি নকল করা হবে এসব ভিডিও ও অডিও প্রসেস করে ডিপফেক ভিডিওটি তৈরি করা হয় যা খালি চোখে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

মেশিন লার্নিং ডিপফেক টেকনোলজি

একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিসীমার পর্যায়কাল মাত্র ০.১ সেকেন্ড। অর্থাৎ, এই ১০০ মিলি সেকেন্ডের কম সময়ে যদি কোন ঘটনা ঘটে যায় তাহলে কোনো দৃশ্য আমাদের চোখে বাঁধবে না। আর ডিপফেক টেকনলোজি দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা এই ডিপফেক ভিডিওগুলোতে নানা ধরনের রূপান্তর ঘটে এর থেকেও অনেক কম সময়ে। আর তাই খালি চোখে এইসব ভিডিওর আসল-নকলের যাচাই করা সম্ভব না।

ডিপফেক টেকনোলজির ভয়াবহতা

সেলিব্রিটিদের নকল পর্নো ভিডিও দিয়ে ডিপফেক প্রথম আলোচনায় আসে। মূলত মহিলা সেলিব্রিটিরা এই ডিপফেক পর্নের দ্বারা হেনস্থার শিকার হয়েছেন। ডেইজি রিডলি, জেনিফার লরেন্স, এমা ওয়াটসন এবং গ্যাল গ্যাডট এর মত বড় বড় তারকার ডিপফেক পর্নোগ্রাফি অনেক বেশি ভাইরাল হয়েছিল। 

ডিপফেক দ্বারা আক্রান্তদের পরবর্তী গ্রুপ হলেন বড় বড় রাজনীতিবিদরা। বেশ কয়েকবছর আগেই আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা কর্তৃক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অপমান করার  ডিপফেক ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। অন্য একটি ডিপফেক ভিডিওতে, রাজনীতিবিদ ন্যান্সি পেলোসির বক্তৃতা এমনভাবে ডিপফেক করা হয়েছিল যাতে দর্শকরা ভাবেন যে তিনি মাতাল ছিলেন যা তৈরি করেছিল শ্যালোফেক। আবার, অন্য একটি ডিপফেক ভিডিওতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে, সদস্যপদ নিয়ে বেলজিয়ামকে উপহাস করতে দেখা যায়। শুধু এসবেই নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি চ্যানেল এমবিএন, তার নিউজ প্রেজেন্টারকে প্রতিস্থাপন করতে ডিপফেক টেকনোলজি ব্যবহার করেছে।

জালিয়াতির হাতিয়ার ডিপফেক টেকনোলজি

ডিপফেক টেকনোলজি ব্যবহার করে জালিয়াতির মত ঘটনাও ঘটেছে। স্ক্যামাররা যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি এনার্জি কোম্পানির সিইওকে তার জার্মান বসের ভয়েস ডিপফেক টেকনোলজির মাধ্যমে নকল করে তাকে একটি তৃতীয় পক্ষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে €২২০,০০০ ইউরো ট্রান্সফার করার নির্দেশ দেয়৷

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে অনলাইনে ১৫,০০০ ডিপফেক ভিডিও ছিল, যা নয় মাসের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর এর ৯৬% ভাগই পর্নোগ্রাফিক ভিডিও এবং এর ৯৯% ভাগই নারী সেলিব্রিটিদের চেহারা পর্ন তারকাদের চেহারা দ্বারা পরিবর্তিত করা। 


ডিপফেকের ফলাফল খুবই ভয়ংকর হয়েছে এবং সামনে আরও ভয়ংকর হবে, বিশেষ করে গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সেলিব্রিটিদের জন্য এটি বিপর্যয়কর পরিণতি নিয়ে আসবে। ডিপফেক এর প্রভাবে শুধু ক্যারিয়ার নয়, জীবন ও নষ্ট করা সম্ভব, কিছুক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েও যেতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক কোন ডিপফেক ঘটনা যুদ্ধ শুরু করার জন্য বিশ্ব নেতাদের নকল ভিডিও ব্যবহার করতে পারে। এই প্রযুক্তি দিয়ে যেমন একজন ব্যক্তির খ্যাতি ক্ষুন্ন করা সম্ভব তেমনি কাউকে দিয়ে এমন কিছু বলাতে বা করাতে পারে যার ফলাফল বিশ্বব্যাপী হতে পারে। আর এ কারনেই প্রযুক্তির ক্যান্সার ডিপফেক টেকনোলজি। 


[ লেখকের এই আর্টিকেলটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল Show Talent ওয়েবসাইটে ]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.